রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ০৭:৫৫ পূর্বাহ্ন
চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ বছর আগে যেখানে চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫ হেক্টর জমিতে বছরে তিনবার ফসল আবাদ হতো, সেখানে সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৯১৩ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে প্রায় ৪১ হাজার ৯২ হেক্টর জমিতে আবাদ কমেছে। এছাড়া পাঁচ বছর আগে যেখানে গড় শস্যের নিবিড়তা ছিল ২০২, এখন সেটা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯৭ শতাংশে।
কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উপকূলীয় এলাকায় বর্ষা মৌসুম ছাড়া অন্যান্য সময় চর জেগে ওঠা এবং চাষাবাদের কারণে জমির উর্বরতা কমে আসায় বছরে এক জমিতে তিন বা তার বেশি চাষাবাদ সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া কৃষি জমিতে আবাসন নির্মাণ, টপ সয়েল কেটে নেয়াসহ বিভিন্ন কারণে চাষাবাদের জমির পরিমাণ কমে আসছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চল চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর নিয়ে গঠিত। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে এক ফসলি জমির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ২ হাজার ৯৪৩ হেক্টর। কিন্তু ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জমির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫ হেক্টর জমি। সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ১১৫ হেক্টরে। এ অঞ্চলে দুই ফসল আবাদের পরিমাণ প্রতি বছর ক্রমে ক্রমে বেড়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫১ হাজার ৭৫৯ হেক্টর জমিতে বছরে অন্তত দুবার ফসল আবাদ হলেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৭৫৪ হেক্টর।
প্রতিবেদন বলছে, চট্টগ্রামে তিন ফসলি জমির পরিমাণ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া হলেও ২০১৭-১৮ অর্থবছরের পরে আবারো নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ১ লাখ ২৯ হাজার ৬৪১ হেক্টর জমিতে বছরে তিনবার ফসল আবাদ হতো। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তিন ফসল আবাদ বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫ হেক্টরে। তবে উপকূল অঞ্চলে চর জেগে ওঠা, জমিতে লবণাক্ততার প্রভাব বেড়ে যাওয়া, দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে দেরিতে ফসল আবাদ, কৃষিজমিতে আবাসন গড়ে ওঠা, টপ সয়েল কেটে নেয়ার কারণে আবারো কমেছে তিন ফসলি জমির পরিমাণ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তিন ফসলি জমির পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৯১৩ হেক্টর। অর্থাৎ ২০০৫-০৬ থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত টানা ১৩ বছর তিন ফসলি জমিতে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলেও গত পাঁচ বছরে কমেছে প্রায় ৪১ হাজার হেক্টরের বেশি। তিনের অধিক ফসলি জমির পরিমাণ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫ হাজার ৫৫২ হেক্টর হলেও এখন সেটা নেমেছে ১ হাজার ৬৮০ হেক্টরে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে ফসলের নিবিড়তা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২০০ শতাংশ হলেও সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ১৯৮ শতাংশ। এছাড়া ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সেচভুক্ত জমির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৫৪ হাজার ৯৩২ হেক্টর। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ১৭ হেক্টর। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে আবাদি জমির পরিমাণ ৬ লাখ ৩ হাজার ৫৩১ হেক্টর হলেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯২ হাজার ৪৬২ হেক্টর।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের উৎপাদন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন ভালো। আগে অনেক জমিতে একবার ফসল উৎপাদন হতো, এখন সেখানে বছরে দুবার আবাদ হচ্ছে। এমনকি অনাবাদি জমিতেও চাষাবাদ শুরু হয়েছে। এ কারণে তিন ফসলি জমিতে আবাদ নিম্নমুখী। কৃষককের বিভিন্ন প্রণোদনা দেয়া ছাড়াও সারা বছর জমিতে চাষাবাদের জন্য আমরা বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছি। সবসময় সব ধরনের জমিতে ফসলের আবাদ এক রকম হয় না। শীত মৌসুমে কোথাও পানির সংকট থাকে, এ কারণে সেখানে হয়তো আবাদ হয় না। আবার সেই জমিতে বর্ষা মৌসুমে দেখা যায় আবাদ বেশি হচ্ছে। জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে। তবে এ অঞ্চলে কৃষককে উৎপাদনমুখী করতে সব ধরনের কাজ করছে কৃষি বিভাগ।’
তিনি আরো বলেন, ‘চট্টগ্রাম শুধু না বাংলাদেশে গত ২০ বছর আগেও প্রযুক্তির এতটা ব্যবহার ছিল না। সময়ের সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি আসার ফলে অল্প জমিতেও বেশি উৎপাদন হচ্ছে। আরো কীভাবে উৎপাদন বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে কৃষি গবেষকরা নতুন নতুন ফসল আবিষ্কার করছেন। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিজমির পরিমাণ কমছে এটা চিন্তার বিষয়। কৃষিজমি রক্ষায় সরকার কাজ করছে। আশা করছি, দেশের কৃষি খাত আরো স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে।’